দারাশিকো - ইতিহাসের একলা মানুষ
- আপলোড সময় : ০১-০১-২০২৬ ০৯:১২:৪৩ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০১-০১-২০২৬ ০৯:১২:৪৩ পূর্বাহ্ন
সুখেন্দু সেন::
ইতিহাস কথাটির সাদামাটা অর্থ অতীত বৃত্তান্ত। এ সহজ সরলের বাইরে ‘ইতিহাস কথা কয়’ এমন একটি গূঢ় তাৎপর্যপূর্ণ ভাষ্যও রয়েছে। ইতিহাসের সংজ্ঞা নির্দেশকারীরা নানাভাবে ইতিহাসের সংজ্ঞা নির্দেশ করেছেন। ছাত্রবেলায় পরীক্ষাতে তেত্রিশ নম্বর পাওয়ার তাগিদে সেগুলি চোখ বুজে মুখস্থ করেছি। ইতিহাস ও রাজনীতির সম্পর্ক আলোচনা কর, এমন প্রশ্নের উত্তরে শিখতে হয়েছিলো - ইতিহাসের সাথে রাজনীতির যোগ না থাকলে তা নিছক সাহিত্যই থেকে যাবে। সে যাই হোক ইতিহাসের সংজ্ঞা নির্ধারণ আজকের লিখার বিষয় নয়।
আমাদের বিদ্যালয়পাঠ্য ইতিহাস বইয়ের অনেকটা জুড়েই রয়েছে মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস। পড়তে ভালোই লাগতো। বাদশাহী শান-শওকত, জৌলুস, হেরেমের কেচ্ছাকাহিনী, শাহজাদা, শাহজাদীর প্রেম-বিরহ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, খাস দরবার, রাজকীয় সিংহাসন, মসনদ দখল, দ্বন্দ্ব-সংঘাত এগুলি পড়তে পড়তে অতীতে হারিয়ে যাওয়ার নেশা ধরানো আচ্ছন্ন এক আমেজ ছিল। কিন্তু এ সুখপাঠ্য ইতিহাস নিমতেতো হয়ে যেতো বাদশাহী বংশপরম্পরার নাম ও সময়গুলি পরীক্ষা কালে ঠিকমত মনে না থাকার কারণে।
বাবার হইলো আবার জ্বর, সারিলো ঔষধে। মুঘল সম্রাটদের নামগুলি অবলীলায় মনে রাখার এমন তরিকা কোন মহান পুরুষ আবিষ্কার করেছিলেন তা না জানলেও তখন এ টোটকাটাই ছিল বিস্মৃতির যন্ত্রণা থেকে উত্তরণের মোক্ষম দাওয়াই। ইতিহাসের ছাত্রদের মুখে মুখে ফিরতো এ আপ্তবাক্যটি। সহজেই হয়ে যেতো বংশ উদ্ধার। ছ’টি শব্দ, যাদের আদ্যক্ষরে এক-একজন মুঘল সম্রাটদের পরিচয়। বাবর, হুমায়ুন, আকবর, জাহাঙ্গীর, সাজাহান (শাহজাহান), ঔরঙ্গজেব তাদের সকল শাহী পদ-পদবী, উপাধি, খেতাব হারিয়ে আমাদের কাছে হয়ে ওঠেছিলেন কোনো এক অজ্ঞাত আবিষ্কর্তার মস্তিষ্কপ্রসূত প্রামাণ্য বাক্য- বাবার হইল জ্বর, সারিল ঔষধে।
আরেকটু বড়বেলায় যখন মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ দর্শাতে গিয়ে চ্যাঁছাছোলা ভাষায় লিখে গিয়েছি ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতির সমালোচনা, তখন মনে মনে ভেবেছি ছেলেবেলার শিখে নেয়া সে প্রামাণ্য বাক্যটি একটু অন্যরকম হলে কী হতে পারতো। বাবার হইলো আবার জ্বর, সারিলো ঔষধে না হয়ে যদি হতো, সারিল ‘দাওয়াইয়ে’ তাহলে ঔরঙ্গজেবের বদলে হয়ে যেতো দারাশিকো।
দাওয়াইয়ের অদ্যাক্ষরে বুঝাতো দারাশিকো। বিশালমনা, উদার হৃদয় এ মানুষটি শাহী তখতে বসার সুযোগ পেলে হয়তো শাহজাহান উত্তর হিন্দুস্তানের ইতিহাস অন্যরকম হতে পারতো।
সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই মানুষের ক্ষমতার রাজনীতিতে ভ্রাতৃসংহার নুতন কোনও ঘটনা নয়। ভাবী মুঘল বাদশারা দিল্লির কুর্সি দখল করার মতলবে হাত রাঙ্গিয়েছেন ভ্রাতৃশোণিতে। শাহজাদা দারাশিকো ইতিহাসের এমনই এক ট্র্যাজিক ‘দাদা’ চরিত্র। জ্ঞানে, গুনে, আচরণে, বিশ্বাসে তিনি সাধারণ মানুষের মন জয় করতে পেরেছিলেন। কিন্তু পাননি ছোট ভাইয়ের ভালোবাসা, পাননি দিল্লির সিংহাসন। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক লক্ষণরেখা অতিক্রম করার মূল্য নিজের জীবন দিয়েই চুকিয়ে দিতে হয়েছিলো তাঁকে।
খুররম্ আর আরজুমন্দ বানু,উত্তরকালে যারা পরিচিতি পেয়েছিলেন সম্রাট শাহজাহান আর বেগম মমতাজমহল রূপে, তাঁদের দ্বিতীয় সন্তান, প্রথম পুত্র দারাশিকো। ১৬১৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্ম, হিজরি মতে ১০২৪ সন। কথিত আছে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির দরবারে মোনাজাতের ফলে এই সন্তান লাভ। স্বভাবতই বাবা-মা’র অতি আদরের। প্রথম সন্তান জাহানারা এবং বড় পুত্র দারাশিকো’র পর আরজুমন্দের কোলে এসেছে আরো অনেক সন্তান। তবে প্রিয়দর্শন, নজরকাড়া ছিলো বড় এবং সেজ পুত্র- দারা আর ঔরঙ্গজেব। সমসাময়িক লেখকদের বর্ণনায় শিশু দারা হলেন নীল চোখ, লাল ঠোঁট, সাদা বরফ পিছল গায়ের রঙের ফুটফুটে উজ্জ্বল ছেলেটি, আর ঔরঙ্গজেব একমাথা কালো চুল, জোড়া ভ্রু, ধবধবে ফর্সা গায়ের আনমনা গম্ভীর শিশু। সেকালে দিল্লি নয় আগ্রা মুঘল সাম্রাজ্যের রাজধানী। আর তামাম রাজ্যবাসীর চোখের মণি, খুররম্ - আরজুমন্দের পরাণপুতলী দারাশিকো বড় হয়ে ওঠছেন আগ্রা দুর্গের নিভৃতিতে। রূপকথার রাজপুত্রের মতই ছেলেবেলায় ঘোড়ায় চড়া, হাতির পিঠে চড়া, অসি চালনাসহ যাবতীয় সামরিক সহবতে পারদর্শী হয়ে ঔঠেছিলেন দারা। কিন্তু তাঁর মন খুঁজতো নিরালা, নির্জনতা। আগ্রা দুর্গের অন্দরে শুরু হয়েছিল সাহিত্যের পাঠ, মরমীয়া জীবনবোধের দীক্ষা। মোল্লা আব্দুল লতিফ সুলতানপুরীর কাছে পড়েন জিন্দানামা, দস্তরই তৈমুর, আনসারির কাব্য।
ইতিহাস যেনো জীবন্ত হয়ে ওঠে চোখের সামনে। কিন্তু ইতিহাস থেকেও দারার বেশী ভালোলাগে কবিতা, গান। অনির্বচনীয় সুর, শব্দ কোন সে অচেনা জগৎ থেকে ভেসে আসে যেন। আরবি হাতের লেখা শেখাতে আসেন মোল্লা মীরক। নাসতালিক লিপির ফারসিতে আলিফ বে কী সুন্দর ঢেউ খেলানো হয়ে ওঠে ওস্তাদজীর হাতের টানে। ইতিহাস আর ক্যালিওগ্রাফির পাঠ ধরে আসে কবিতা - ফেরদৌসি, হাফিজ, জালালুদ্দিন রুমি’র রুবাইয়া। ফারসি কবিতার ভাব সমুদ্রে ডুব দেন শাহজাদা দারাশিকো। মাঝে মাঝে আলোচনা হয় ভাই ঔরঙ্গজেবের সঙ্গে। সে আবার এ রসে বঞ্চিত। একটু আধটু হাফিজ পড়লেও ফেরদৌসি, রুমির কাব্যিক ভাবালুতা তার মন মজায় না। মুঘল মসনদের শান- শওকত তাঁর কাছে ঢের আকর্ষণীয়।
বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ভাবীকালের মুঘল স¤্রাট হিসেবে দর বাড়তে থাকে দারাশিকোর। মাত্র আঠারো বছর বয়সে তিনি পান সামরিক কমান্ডারের পদ মর্যাদা। বারো হাজার পদাতিক আর ছয় হাজার ঘোড়ার মালিকানা। সম্রাট শাহজাহান এতোই ভালোবাসতেন দারাকে যে, তাঁর জন্য নিজে থেকেই অনেকগুলো পদ তৈরি করে নিয়েছিলেন, যাতে পুত্র আগ্রায় চোখের কাছাকাছি থাকেন। সম্রাট তাঁর এই পুত্রের মাঝে পিতামহ আকবরের ছায়া দেখতে পেতেন। ১৬৪২ সালে দারাশিকো পান ‘শাহজাদা-ই-বুলন্দ’ উপাধি। পরবর্তী পাঁচ-ছ বছরে হাতে আসে এলাহাবাদ আর গুজরাটের সুবেদারি। এই সময় থেকেই সম্রাট শাহজাহানের অসুস্থতা দারার দায়িত্ব ও পদ মর্যাদাকে আরো বাড়িয়ে তোলে।
মুলতান, কাবুলের গভর্নর হন তিনি আর ১৬৫৫ সালে সম্রাট তাঁকে ‘শাহ-ই-বুলন্দ ইকবাল’ খেতাবে ভূষিত করেন। ক্রমে ঈর্ষান্বিত তিন কনিষ্ঠের মসনদ দখলের আগ্রাসী মনোভাব চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে যেতে থাকে। ১৬৫৭ সালে দারাশিকো যখন বিহারের অধিপতি তখন তাঁর বয়স বিয়াল্লিশ বছর। ততদিনে তিনি বিবাহিত, বেগম নাদিরা বানু বেগমের গর্ভজাত সাতটি সন্তানের জনক। নাদিরা বানুও ছিলেন হেরেমের একজন বুদ্ধিমতি, প্রখর জ্ঞানের অধিকারী, রূপসী ও প্রভাবশালী মহিলা। তিনি ফরমান জারী ও বাদশাহী সিলমোহরের অধিকারী ছিলেন। মুঘল সাম্রাজ্যের আরেক প্রভাবশালী শাহজাদী জাহানারা ব্যতিত আর কোনও নারী এমন মর্যাদার অধিকারী ছিলেন না। স্বামী হিসেবে দারা ছিলেন একজন আদর্শ পুরুষ। নাদিরা বানু এবং দারাশিকো একে অপরের প্রতি বিশ্বস্ততার সাথে অনুগত ছিলেন। তাঁদের প্রেম শাহজাহান-মমতাজ মহলের প্রেমের চেয়েও আরো মহিমান্বিত ও বিশ্বস্ত প্রমাণিত হয়েছিল। তিনি তাঁর পিতার মত অন্য কোনও বিবাহ করেননি। এমন কী নাদিরা বেগমের মৃত্যুর পরেও।
মুঘল ইতিহাসে দারাশিকো’র উত্থান ও পতন যেনো এক অবিশ্বাস্য রূপকথা। দারা ক্ষমতা, পদমর্যাদা পেয়েছিলেন কিন্তু সে অর্থে ক্ষমতালিপ্সু ছিলেন না কোনও কালে। বিশাল এক মন ছিলো তাঁর। মানসজাত বিশ্বাসে মনে করতেন, বিধির বিধানে আর মানুষের ভালোবাসায় সময়কালে তিনি এমনিতেই হয়ে যাবেন মুঘল সাম্রাজ্যের অধিশ্বর। অনেক ইতিহাসবিদ, সমালোচক মনে করেন দারার এই দুর্বলতার সুযোগটাই ঔরঙ্গজেব কাজে লাগিয়েছিলেন। চিরলড়াকু দক্ষিণ দেশের সুবেদারি ঔরঙ্গজেবকে আরও কঠিন, দুর্দম করে তুলেছিলো। শাহজানের নেক নজর থেকে বঞ্চিত ছিলেন ঔরঙ্গজেব। জনগণের হৃদয়ের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন দারা। ভ্রাতৃঘাতি সংঘর্ষে বড়ভাইকে খুন করে দিল্লির সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন গোঁড়া, কট্টরপন্থি ঔরঙ্গজেব।
শাহজাদা দারাশিকো’র ধর্মবিশ্বাস নিয়ে চর্চা, আলোচনা-সমালোচনা ও লেখালেখির শেষ নেই। ভারতীয় উপমহাদেশে দারা ছিলেন আজকের ভাষায়, লিবারেল, পরমতসহিষ্ণু। প্রপিতামহ সম্রাট আকবরের মতো ইসলামকে জেনে বুঝে তিনি তাঁর মনকে প্রসারিত করেছিলেন মরমিয়া সুফি সাধনা আর বেদান্তিক দর্শনের দিকে। মহামতি আকবরের দর্শন চর্চা, সমন্বয়বাদ, উদারনীতির উত্তরাধিকার তিনি। বলা বাহুল্য, এ-কাজে তাঁর কপালে জুটেছিলো তদানীন্তন উলেমা-ওমরাদের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত অপমান আর নানা কুৎসা। অনুজ ঔরঙ্গজেব তাঁকে বলতেন কাফির, বিধর্মী। জ্যেষ্ঠের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রায় তিনি হাতিয়ারও করেছিলেন ভ্রাতার এই বহুতর ধর্মবিশ্বাসকে। দারাশিকো’র কিছু যায় আসেনি তাতে। তিনি চলে যেতেন লাহোরে কাদেরি সুফি-সন্ত হজরত মিয়া মীরের কাছে, ভাবে বিভোর হয়ে পড়ে থাকতেন মিয়া মীর এর আস্তানায়। এই মিয়া মীর এমনই বড় মাপের সাধক ছিলেন যে, হিন্দু, মুসলিম, শিখ নির্বিশেষে সবাই তাঁর কাছে আসতো। অমৃতসরের বিখ্যাত স্বর্ণ মন্দিরও উদ্বোধন করেছিলেন তিনি। মিয়া মীরের ভাব সান্নিধ্যে দারাশিকো’র মনের সব আগল খুলে গিয়েছিলো। শান্তির ধর্ম ইসলামকে তিনি খুঁজে পান ধ্যানের গভীরে, তুরীয় প্রসন্নতায়। জনশ্রুতি, মিয়া মীরের কৃপায় সুলতান-উল-আজকর শুনতে পেয়েছিলেন দারা। ভাবসমাধি হয়েছিলো তাঁর। উদার দারাশিকো হিন্দু শাস্ত্রীয় প-িত, ধর্মগুরুদের পৃষ্ঠপোষকতাও করেছিলেন। খ্রিস্টান ধর্মের প্রতিও সহানুভূতিশীল ছিলেন তিনি। ফাদার বুসি, পেড্রো জুজার্ত ছিলেন দারার পরম সুহৃদ। ইসলাম, সুফিয়ানা, বেদান্তের মাঝে একত্বের আবিষ্কার দারাশিকোকে উদ্বুদ্ধ করেছিলো সংস্কৃত থেকে ফারসিতে উপনিষদ অনুবাদে।
কালের নিরিখে বিচার করতে গেলে এ এক অভাবনীয় মানস বিপ্লব। অমর্ত্য সেন তাঁর এক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- দারাশিকোর উপনিষদ অনুবাদই সম্ভবত স্যার উইলিয়াম জোন্সকে ভারতীয় সাহিত্য সংস্কৃতিতে উৎসাহিত করেছিলো। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তাঁর এই বহুধর্ম বিশ্বাস তখনকার গোঁড়া মুসলমান সভাসদদের কাছে ঘৃণ্য পাপী করে তুলেছিলো। ঔরঙ্গজেবের কাছে তিনি ছিলেন একজন ধর্মদ্রোহী, ধর্মত্যাগী মানুষ। শিল্প, সংগীত, চিত্রকলার সমজদার ছিলেন দারাশিকো। সুফি গান আর হিন্দু কীর্তন বড় প্রিয় ছিলো তাঁর। বিশ্ববিশ্রুত মুঘল মিনিয়েচার আর্টের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তিনি। নিজে ছবি আঁকতেন। সেসব ছবি ‘দারাশিকো অ্যালবাম’ নামে খ্যাতি পেয়ে বৃটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। মুঘল স্থাপত্যের বেশ ক’টি নিদর্শন তাঁরই অবদান - লাহোরে স্ত্রী নাদিরা বানু এবং মিয়া মীরের সমাধি, কাশ্মীরের শ্রীনগরে পরিমহল, মুল্লা শাহ মসজিদ, এগুলি তাঁর উল্লেখযোগ্য কীর্তি। বড় ভগ্নী জাহানারার মত তিনিও ছিলেন কবিতা প্রেমী, কবিতা লিখতেন। মিয়া মীর, মুল্লা শাহ প্রমুখ সন্তদের জীবন অবলম্বনে লিখেন ‘সাকিনাত-উল-আউলিয়া’। তাঁর লিখিত গ্রন্থ ‘মাজমা-উল-বাহরিন’ (দুই সমুদ্রের সঙ্গম) এর ছত্রে ছত্রে দারার জ্বলন্ত জীবনবোধ, রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে অবস্থান মুদ্রিত হয়ে আছে। আপন ভাবময়তাসঞ্জাত উপলব্ধি থেকে তিনি আরও লিখেছিলেন ‘তরিকাত- উল- হকিকত’, ‘রিসাত-ই-হকনামা’ বইগুলো।
সম্রাট শাহজাহান তখন অসুস্থ। চার পুত্রের মধ্যে চলছে মসনদ দখলের রক্তক্ষয়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ১৬৫৯ সালের ৩০ আগস্ট, চুয়াল্লিশ বছর বয়সে ঔরঙ্গজেবের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত বন্দী দারাশিকোকে ভাইয়ের নির্দেশে শিরñেদ করা হয় নিজ পুত্র সিপাহ শিকোর চোখের সামনে। ততদিনে সম্রাট শাহজাহান ও জাহানারা ঔরঙ্গজেবের হাতে বন্দী। ফরাসি পর্যটক ও চিকিৎসক ফাসোয়া বার্নিয় যিনি মুঘল দরবারে প্রায় বারো বৎসর অবস্থানকালে শাহাজাদা দারাশিকো’র এবং পরবর্তী সময়ে সম্রাট আওরঙ্গজেবের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন, তাঁর বর্ণনায় বিধৃত হয়েছে সেই যন্ত্রণাবিদ্ধ মৃত্যুর আখ্যান।
শাহী মসনদ তিনি পান নি কিন্তু এই উদার দার্শনিক যুবরাজ পেয়েছেন জনশ্রদ্ধা, কাব্যে সাহিত্যে অভিষিক্ত হয়েছেন হৃদয়বান বীরের মর্যাদায়। রাজনৈতিক কূটকৌশল, সামরিক কুশলতার ব্যর্থতায় কোহিনূর খচিত রাজমুকুট আর ময়ূরসিংহাসন পাওয়ার বদলে মানুষের ধর্ম খুঁজতে গিয়ে তাঁর মাথাটিই হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি সমাহিত হয়েছিলেন চিহ্নহীন এক কবরে যা আজও সনাক্ত করা যায়নি। ধারণা করা হয় হুমায়ুনের সমাধিক্ষেত্রের পাশে কোনও একটি সমাধি দারাশিকো’র হতে পারে। কারও কারও মতে তাঁর মস্তক তাজমহল প্রাঙ্গণের কোথাও এবং দেহ হুমায়ুনের সমাধি ক্ষেত্রে সমাহিত।
দারশিকো শিল্প, সাহিত্য, দর্শন চর্চায়, মানবিকতায়, সমুজ্জ্বল এক ট্র্যাজিক চরিত্র হয়েই থেকে গেছেন। প্রায় সাড়ে তিনশত বছরের মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে সম্রাট না হয়েও অনেক সম্রাট চেয়েও তিনি বেশী আলোচিত। দারাশিকো সময়ের চেয়েও এগিয়ে থাকা, এগিয়ে দেখা এক সরল প্রাণ। বিশ্বাসে-বিচারে, অনুভবে-অপমানে ঋব্ধ, বিদ্ধ এক একলা মানুষ।
তথ্য সূত্র : শাহজাদা দারাশুকো- শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়।
শাহজাদা দারাশিকো, মুঘল সাম্রাজ্যের ট্র্যাজিক হিরো- মাহফুজ পারভেজ।
মুঘল ভারতের ইতিহাস- ড. মুহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক